Header Ads

ইসমতে আম্বিয়া: নবীরা কি স্বভাবজাত গুনাহে অভ্যাস্ত ছিলেন?

 

প্রশ্ন:

রাসুল -এর স্বভাবজাতভাবে গুনাহের ইচ্ছা তৈরি হলে  তিনি নিজের চেষ্টা ও মেহনতের মাধ্যমে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতেন। এ বক্তব্য কি আকিদাগতভাবে সঠিক? 

উত্তর:

সম্মানিত প্রশ্নকারী! 

আপনার উল্লেখ করা বক্তব্যটি আকিদার মানদণ্ডে সঠিক নয়। কেননা এটা সরাসরি ইসমাতুল আম্বিয়া' বা নবীদের নিষ্পাপত্ব আকিদার পরিপন্থি। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অকিদা হলো, নবী ও রাসূলগণ জন্মগত এবং স্বভাবজাতভাবেই সমস্ত ছোট-বড় গুনাহ এবং গুনাহের পঙ্কিল ইচ্ছা থেকে মুক্ত। 



‘ইসমাতুল আম্বিয়া’ বা নবীগণের অভ্রান্ততা:

ইসলামী আকিদার পরিভাষায় ‘ইসমাতুল আম্বিয়া’ বলতে নবীগণের অভ্রান্ততা ও নিষ্পাপত্বকে (Infallibility/Sinlessness) বোঝায়। মহান আল্লাহ নবী-রাসূলগণকে তাঁর বিশেষ তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ ও হেফাযত করেন। ফলে তাঁরা কোনো ধরনের বিভ্রান্তি, ভুল বা পাপের মধ্যে নিপতিত হন না।কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, সকল নবী-রাসূলই আল্লাহর মনোনীত, নিষ্কলুষ ও নিষ্পাপ প্রিয় বান্দা ছিলেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বারংবার ঘোষণা করেছেন যে, নবীগণ বিশেষভাবে আল্লাহর রহমত, হেদায়াত ও মনোনয়ন প্রাপ্ত।


নবীদের পঙ্কিলতার ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

আয়াত: এক। 

يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ

‘‘হে রাসূল, আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা আপনি প্রচার করুন। যদি আপনি তা না করেন, তবে তো আপনি তাঁর বার্তা প্রচার করলেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষদের (অনিষ্ট) থেকে রক্ষা করবেন।। (সুরা আল মায়েদা, আয়াত। ৬৭) 


আয়াত: দুই।  

اللَّهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ

আল্লাহ ভালো করেই জানেন, কার ওপর তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব অর্পণ করবেন। (সুরা আনআম:124)

এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, বিশেষ মনোনীত, নিষ্কলুষ ও নিষ্পাপ ব্যক্তি ছাড়া আল্লাহ তাআলা অন্য কাউকে রিসালাতের মতো মহান দায়িত্ব প্রদান করেন না। 

আয়াত: তিন।

أُولَئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ مِنْ ذُرِّيَّةِ آَدَمَ وَمِمَّنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ وَمِنْ ذُرِّيَّةِ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْرَائِيلَ وَمِمَّنْ هَدَيْنَا وَاجْتَبَيْنَا

‘‘এরাই তারা—নবীগণের মধ্য থেকে যাদের ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন; এরা আদমের বংশোদ্ভূত এবং যাদের আমি নূহের সাথে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম তাদের বংশোদ্ভূত, আর ইবরাহীম ও ইসরাঈলের বংশোদ্ভূত এবং যাদের আমি পথ-নির্দেশ করেছিলাম ও মনোনীত করেছিলাম।’’ (সুরা মারিয়াম: আয়াত ৫৮)

এছাড়াও পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বারংবার নবীগণকে ‘পবিত্র’, ‘একনিষ্ঠ’ ও ‘সৎকর্মপরায়ণ’ ইত্যাদি অনন্য বিশেষণে ভূষিত করেছেন। সর্বোপরি, মহান আল্লাহ সমগ্র মানবজাতিকে নবী-রাসূলদের ‘ইত্তিবা’ বা নিঃশর্ত অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর এই নির্দেশই প্রমাণ করে যে তাঁরা সম্পূর্ণ ‘নিষ্পাপ’ ছিলেন। কারণ, যাঁর দ্বারা পাপ বা ভুল আদর্শ প্রচারিত হওয়ার সামান্যতম সম্ভাবনা থাকে, তাঁকে নিঃশর্তভাবে অনুকরণ করার নির্দেশ আল্লাহ কখনোই দিতে পারেন না।

‘ইসমাতুল আম্বিয়া’ বা নবীগণের নিষ্পাপত্ব বিষয়ে ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) তাঁর প্রসিদ্ধ 'আল-ফিকহুল আকবার' গ্রন্থে বলেন:

الأنبياء كلهم مُنَزَّهُون عن الصغائر والكبائر والكفر والقبائح، وقد كانت منهم زلات وخطيئات. ومحمد (ﷺ) نببه، وعبده ورسوله، وصفيه ونقيه، ولم يعبد الصنم ولم يشرك بالله تعالي طرفة عين قط، ولم يرتكب صغيرة ولا كبيرة قط.

‘‘নবীগণ সকলেই সগীরা গুনাহ, কবীরা গুনাহ, কুফর ও অশালীন কর্ম থেকে পবিত্র ও মুক্ত ছিলেন। তবে কখনো কখনো (অনিচ্ছাকৃত) সামান্য পদস্খলন ও ত্রুটি-বিচ্যুতি তাঁদের থেকে প্রকাশ পেয়েছে। আর মুহাম্মাদ (ﷺ) হলেন আল্লাহর নবী, তাঁর বান্দা, তাঁর রাসূল, তাঁর মনোনীত ও নিখাদ নিখুঁত প্রিয়তম সৃষ্টি। তিনি কখনো মূর্তির ইবাদত করেননি এবং জীবনের এক পলকের জন্যও আল্লাহর সাথে শিরক করেননি। এমনকি তিনি (নবুয়তের আগেও) কখনোই কোনো সগীরা বা কবীরা গুনাহে লিপ্ত হননি।’’

আল-আকাইদ আন-নাসাফিয়্যাহ’-এর লেখক আল্লামা উমর ইবনু মুহাম্মাদ আন-নাসাফী (৫৩৭ হি.) আম্বিয়া আ. গুণাবলী প্রসঙ্গে বলেন: 

كلهم كانوا مخبرين مبلغين عن الله تعالى صادقين ناصحين للخلق

‘‘তাঁরা সকলেই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ প্রদান করেছেন এবং প্রচার করেছেন, সত্যবাদী ছিলেন, সৃষ্টির উপদেশদাতা ও কল্যাণকামী ছিলেন।

এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা ও বিশদ বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে আল্লামা সা’দ উদ্দীন তাফতাযানী (৭৯১ হি.) তাঁর বিখ্যাত ‘শারহুল আকাইদ আন-নাসাফিয়্যাহ’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। যার সারকথা হলো, আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের সকল আলিম এ বিষয়ে একমত যে, নবীগণ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো নিষিদ্ধ বা পাপের কর্ম করতে পারেন না। তবে অসতর্কতা, বেখেয়াল বা ভুলের কারণে যা ঘটে, সেগুলোকে গুনাহ বলা হয় না, বরং তা কেবল ‘যাল্লাত’ বা সাধারণ পদস্খলন ও ত্রুটি হিসেবে অভিহিত করা হয়।


সাইদুজ্জামান কাসেমি

মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।









No comments

Powered by Blogger.