Header Ads

AI ডেভেলপমেন্ট এর কাজ করার বিধান

 

প্রশ্ন:

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা AI ডেভেলপমেন্ট এর কাজ করা কি বৈধ?

উত্তর:

সম্মানিত প্রশ্নকারী!

শরীয়তের দৃষ্টিতে যেকোনো পেশা হালাল হওয়ার জন্য শর্ত হলো তার ওই পেশায় যে কাজ করা হবে এবং যেবিষয়ে করা হবে সেটা হালাল হতে হবে। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রযুক্তি নিজেই হালাল বা হারাম নয়, বরং এর ব্যবহারের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি এটিকে বৈধ বা অবৈধ করে।

    আবিষ্কার বা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মূল নীতি হলো—"সব বস্তু মূলত বৈধ, যতক্ষণ না তা হারাম হওয়ার কোনো দলিল পাওয়া যায়"। এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের তৈরি একটি শক্তিশালী মাধ্যম বা টুলমাত্র। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হালাল বা হারাম নয়; বরং এর ব্যবহারকারী এবং ডেভেলপারের উদ্দেশ্য ও প্রয়োগের ওপর ভিত্তি করে এটি হালাল বা জায়েজ হয়। 

    সুতরাং যদি কুরআন-হাদিসের মৌলিক নীতিমালার আলোকে এআই-এর ব্যবহার করা হয় তাহলে সেটা হালাহ হবে। না হলে হালাল হবে না।  যেভাবে হালাল হতে পারে, তার দলিলসহ বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো।

১. মানবকল্যাণ ও উপকারী জ্ঞান সৃষ্টি (المصلحة العامة)

এআই যদি চিকিৎসা, শিক্ষা, বিজ্ঞান, ও প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়াতে এবং মানুষের উপকার করতে ব্যবহার করা হয়, তবে তা শরিয়তে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও হালাল। কেননা আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا

অর্থ: "তিনিই সেই সত্তা, যিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের (কল্যাণের) জন্য সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: خَيْرُ النَّاسِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ অর্থ: "মানুষের মধ্যে সেই সর্বোত্তম, যিনি মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।" (আল-মু'জামুল আওসাত: ৫৭৮৭)

২. ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে দূরে থাকা (عدم الضرر)

এআই ডেভেলপমেন্টের সময় এমন কোনো অ্যালগরিদম বা কোড তৈরি করা যাবে না যা মানুষের নিজের কিংবা অন্যের ক্ষতি সাধ করে, গোপনীয়তা নষ্ট করে, সাইবার হামলা চালায় কিংবা সমাজের কোনো ক্ষতি সাধন করে। কেননা আল্লাহ তায়লা ইরশাদ করেন, وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ  অর্থ: "এবং তোমরা নিজেদের হাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।" (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৯৫)

ইসলামের একটি মৌলিক আইনি মূলনীতি — যা সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস থেকে এসেছে: لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ  অর্থ: "ইসলামে নিজের ক্ষতি করা যাবে না, অন্যের ক্ষতিও করা যাবে না।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪০)

৩. সত্যতা বজায় রাখা এবং মিথ্যা ও প্রতারণা বর্জন (الصدق والأمانة)

বর্তমানে এআই-এর মাধ্যমে ভুয়া ছবি, ভিডিও (Deepfake), বা মিথ্যা কনটেন্ট তৈরি করা খুব সহজ হয়ে গেছে। এআই ব্যবহার করে এমন কোনো কাজ করা যাবে না যা জালিয়াতি বা ধোঁকা সৃষ্টির শামিল। এব্যাপরে  কুরআন সুন্নাহে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ  অর্থ: "হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।" (সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১১৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন: مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا  অর্থ: "যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা বা ধোঁকাবাজি করবে, সে আমাদের (উম্মতের) দলভুক্ত নয়।" (সহীহ মুসলিম: ১০২)

৪. তথ্য যাচাই ও সঠিক উৎস নিশ্চিতকরণ (التثبت)

এআই মডেলগুলো অনেক সময় ভুল বা মনগড়া তথ্য দেয় (যাকে এআই পরিভাষায় Hallucination বলা হয়।   দ্বীনি বা জাগতিক কোনো বিষয়ে এআই-এর দেওয়া তথ্যের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, বিশেষ করে ফতোয়া বা শরিয়তের মাসআলার ক্ষেত্রে।

আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا অর্থ: "হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও।" (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৬)

আরো ইরশাদ করেন, فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ অর্থ: "যদি তোমরা না জানো, তবে জ্ঞানীদের (আলেমদের) জিজ্ঞাসা করো।" (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৪৩)


সারকথা : আপনি যদি এআই ডেভেলপার হিসেবে কাজ করতে চান, তবে আপনার কাজটি হালাল রাখতে ৩টি বিষয় নিশ্চিত করুন।

হালাল প্রজেক্ট: আপনার তৈরি এআইটি যেন কোনো হারাম কাজ (যেমন: সুদভিত্তিক ফিনটেক, জুয়া, অশ্লীলতা বা জালিয়াতি) প্রচার বা সহযোগিতা না করে।


ন্যায্য ডেটা (Ethical Data): আই ট্রেন করার জন্য চুরি করা ডেটা বা কপিরাইট আইন লঙ্ঘনকারী ডেটা ব্যবহার থেকে বিরত থাকা।


নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি: এআই-কে এমন স্বাধীনতা না দেওয়া যা মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ ও জীবনের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। 


সাইদুজ্জামান কাসেমি
মুফতী ও মুহাদ্দিস, 
জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।



No comments

Powered by Blogger.