Header Ads

নবীজির খাদ্যাভ্যাস

 সম্মানিত প্রশ্নকারী ভাই!  

163785

এক/দুই তরকারি দিয়ে খাওয়া সুন্নত এ মর্মে সুস্পষ্ট কোনো হাদিস বা ফিকহি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


ইসলাম হালাল খাবারের ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করেনি। এটা মানুষের যোগান-চাহিদা এবং রুচির ওপর নির্ভরশীল। যদি কারও অধিক একাধিক প্রকারের তরকারী ব্যবস্থা করার সামর্থ্য থাকে তাহলে ইসলাম তাকে এক তরকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে বাধ্য করেনি। এমনিভাবে যদি হালালভাবে কারও এক তরকারি ব্যবস্থা করাও সামর্থ্য না থাকে তাহলে তাকে হারাম তরিকায় একাধিক তরকারির বন্দোবস্ত করার অনুমতিও প্রদান করেনি।


তবে হালালের ক্ষেত্রে ইসলামের দিকনির্দেশনা হলো-

وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ

খাও এবং পান করো, তবে অপচয় করো না। নিশ্চয়ই অপচয়কারীদের আল্লাহ পছন্দ করেন না। (সুরা আরাফ-৩১)

প্রসঙ্গক্রমে  আপনার মৌলিক উত্তরের সাথে নবী সা.  এর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করা হলো।

 

*********************************

নবীজির খাদ্যাভ্যাস:

আজকের যুগে সমাজপতি ও ধনীদের বাড়িতে খাবারের বিলাসী আয়োজন নিত্যদিনের ব্যাপার। অন্যদিকে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধীনে ছিল এক বিশাল রাষ্ট্র এবং অসংখ্য অনুসারী। তাঁর নিকট উট বোঝাই খাদ্যদ্রব্য আসত, তাঁর সামনে বয়ে যেত সোনা-দানার প্রাচুর্য।


কিন্তু আপনি কি জানেন, এই মহান রাষ্ট্রনায়কের পানাহার কেমন ছিল? কোনো রাজা-বাদশাহর মতো আরাম-আয়েশের, নাকি ভোগ-বিলাসে মত্ত কোনো ধনকুবেরের মতো? না, তাঁর জীবন এমন ছিল না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অতি সাধারণ ও অভাবী পানাহারের কথা শুনলে যে কেউ বিস্মিত হবেন।



আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাদেরকে বর্ণনা করছেন, তিনি বলেন:

حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ مَنِيعٍ، حَدَّثَنَا عَبَّادُ بْنُ عَبَّادٍ الْمُهَلَّبِيُّ، عَنْ مُجَالِدٍ، عَنِ الشَّعْبِيِّ، عَنْ مَسْرُوقٍ، قَالَ دَخَلْتُ عَلَى عَائِشَةَ فَدَعَتْ لِي بِطَعَامٍ وَقَالَتْ مَا أَشْبَعُ مِنْ طَعَامٍ فَأَشَاءُ أَنْ أَبْكِيَ إِلاَّ بَكَيْتُ . قَالَ قُلْتُ لِمَ قَالَتْ أَذْكُرُ الْحَالَ الَّتِي فَارَقَ عَلَيْهَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الدُّنْيَا وَاللَّهِ مَا شَبِعَ مِنْ خُبْزٍ وَلَحْمٍ مَرَّتَيْنِ فِي يَوْمٍ . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ .


২৩৫৯. আহমাদ ইবনে মানী‘ (রাহঃ) ......... মাসরূক (রাহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়িশা (রাযিঃ) এর কাছে গেলাম। তিনি আমার জন্য খানা নিয়ে আসতে বললেন, পরে বললেনঃ আমি পেট পুরে কখনো খাইনি। আমি যদি তাতে কাঁদতে চাই তবে কাঁদতে পারি। আমি বললাম তা কেন? তিনি বললেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে অবস্থায় দুনিয়া ত্যাগ করে গিয়েছেন, সে কথা মনে পড়ছে। আল্লাহর কসম, তিনি কখনো দিনে দুই বেলা রুটি-গোশত পেট পুরে খেতে পান নি।


জামে' তিরমিযী


৩৬. যুহদ-দুনিয়া বিমুখতার বর্ণনা


হাদীস নংঃ ২৩৫৬


আন্তর্জাতিক নং: ২৩৫৬


হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/32001



অর্থাৎ, তিনি নিজে কখনো বিলাসী খাবার খেয়ে তৃপ্ত হতেন না, বরং যেকোনো সাধারণ খাবার দিয়ে কোনোমতে দিন পার করে দিতেন। কেবল বাড়িতে মেহমান এলে তাদের সম্মান ও আনন্দের জন্য নিজে একটু ভালো করে খেতেন। 


আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

حَدَّثَنَا زُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، وَإِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ إِسْحَاقُ أَخْبَرَنَا وَقَالَ، زُهَيْرٌ حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ، عَنِ الأَسْوَدِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ مَا شَبِعَ آلُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم مُنْذُ قَدِمَ الْمَدِينَةَ مِنْ طَعَامِ بُرٍّ ثَلاَثَ لَيَالٍ تِبَاعًا حَتَّى قُبِضَ .


৭১৭৪। যুহাইর ইবনে হারব ও ইসহাক ইবনে ইররাহীম (রাহঃ) ......... আয়িশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ (ﷺ) এর পরিজন মদীনায় আসার পর লাগাতার তিন দিন গমের রুটি পরিতৃপ্ত হয়ে খাননি। আর এ অবস্থায় তাঁর ইন্‌তিকাল হয়ে গেল।

সহীহ মুসলিম হাদীস নংঃ ৭১৭৪

হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/14223




অন্য বর্ণনায় এসেছে:

«ما شبع آل محمد منذ قام المدينة من طعام بر ثلاث ليال تباعًا حتى قبض».

حَدَّثَنَا زُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، وَإِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ إِسْحَاقُ أَخْبَرَنَا وَقَالَ، زُهَيْرٌ حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ، عَنِ الأَسْوَدِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ مَا شَبِعَ آلُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم مُنْذُ قَدِمَ الْمَدِينَةَ مِنْ طَعَامِ بُرٍّ ثَلاَثَ لَيَالٍ تِبَاعًا حَتَّى قُبِضَ .আয়িশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ (ﷺ) এর পরিজন মদীনায় আসার পর লাগাতার তিন দিন গমের রুটি পরিতৃপ্ত হয়ে খাননি। আর এ অবস্থায় তাঁর ইন্‌তিকাল হয়ে গেল। (সহীহ মুসলিম হাদীস নংঃ ৭১৭৪)

হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/14223



এমন পরিস্থিতিও হতো যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে খাওয়ার মতো কিছুই পেতেন না। তখন এক লোকমা খাবারও পেটে না দিয়ে, তীব্র ক্ষুধার্ত অবস্থায় তাঁকে রাত কাটিয়ে দিতে হতো বা ঘুমিয়ে পড়তে হতো!


ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُعَاوِيَةَ الْجُمَحِيُّ، حَدَّثَنَا ثَابِتُ بْنُ يَزِيدَ، عَنْ هِلاَلِ بْنِ خَبَّابٍ، عَنْ عِكْرِمَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَبِيتُ اللَّيَالِيَ الْمُتَتَابِعَةَ طَاوِيًا وَأَهْلُهُ لاَ يَجِدُونَ عَشَاءً وَكَانَ أَكْثَرُ خُبْزِهِمْ خُبْزَ الشَّعِيرِ . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ .

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যগণ পর পর কয়েক রাত্রি ক্ষুধার্ত অবস্থায় কাটত। তাদের জন্য রাত্রি আহারের সংস্থান হত না, অধিকাংশ দিন যবের রুটিই ছিল তাদের খাদ্য।


(জামে' তিরমিযী হাদীস নংঃ ২৩৬০)

হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/32005




এই কৃচ্ছ্রসাধন কিন্তু সম্পদের স্বল্পতার কারণে ছিল না। কারণ, তাঁর অধীনে ছিল বিপুল রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং প্রায়শই খাদ্যসামগ্রী বোঝাই বড় বড় কাফেলা তাঁর দরবারে এসে উপস্থিত হতো। মূলত, আল্লাহ তাআলা নিজেই তাঁর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন ও অবস্থাকে পার্থিব মোহমুক্ত, বিশুদ্ধ এবং আধ্যাত্মিকভাবে পরিপূর্ণ রূপে দেখতে পছন্দ করেছিলেন।



1430 - حَدَّثَنَا أَبُو عَاصِمٍ، عَنْ عُمَرَ بْنِ سَعِيدٍ، عَنِ ابْنِ أَبِي مُلَيْكَةَ، أَنَّ عُقْبَةَ بْنَ الحَارِثِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ حَدَّثَهُ، قَالَ: صَلَّى بِنَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ العَصْرَ، فَأَسْرَعَ، ثُمَّ دَخَلَ البَيْتَ فَلَمْ يَلْبَثْ أَنْ خَرَجَ، فَقُلْتُ أَوْ قِيلَ لَهُ، فَقَالَ: «كُنْتُ خَلَّفْتُ فِي البَيْتِ تِبْرًا مِنَ الصَّدَقَةِ، فَكَرِهْتُ أَنْ أُبَيِّتَهُ، فَقَسَمْتُهُ»


উকবা ইবনে হারিস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আসরের নামায আদায় করে তাড়াতাড়ি ঘরে প্রবেশ করলেন। তারপর দেরী না করে বের হয়ে আসলেন। আমি বললাম বা তাঁকে বলা হল, তখন তিনি বললেন,

«كنت خلفت في البيت تبرًا -أي ذهبًا- من الصدقة فكرهت أن أبيته فقسمته».

ঘরে সাদ্‌কার একখণ্ড সোনা রেখে এসেছিলাম কিন্তু রাত পর্যন্ত তা ঘরে থাকা আমি পছন্দ করিনি। কাজেই তা বন্টন করে দিয়ে এলাম।


সহীহ বুখারী হাদীস নং-১৪৩০

হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/1346



পার্থিব সম্পদের প্রতি এই অনীহার পেছনে ছিল তাঁর এক আশ্চর্যজনক বদান্যতা এবং অবিচ্ছিন্ন দানশীলতা। এই উম্মতের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র হাত থেকে প্রতিনিয়ত যেভাবে অকাতরে দান-সদকা বিলিয়ে দেওয়া হতো, ইতিহাসে তার কোনো অতুলনীয় দৃষ্টান্ত বা উপমা খুঁজে পাওয়া মেলা ভার।



আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:


وَحَدَّثَنَا عَاصِمُ بْنُ النَّضْرِ التَّيْمِيُّ، حَدَّثَنَا خَالِدٌ، - يَعْنِي ابْنَ الْحَارِثِ - حَدَّثَنَا حُمَيْدٌ، عَنْ مُوسَى بْنِ أَنَسٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ مَا سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى الإِسْلاَمِ شَيْئًا إِلاَّ أَعْطَاهُ - قَالَ - فَجَاءَهُ رَجُلٌ فَأَعْطَاهُ غَنَمًا بَيْنَ جَبَلَيْنِ فَرَجَعَ إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ يَا قَوْمِ أَسْلِمُوا فَإِنَّ مُحَمَّدًا يُعْطِي عَطَاءً لاَ يَخْشَى الْفَاقَةَ .


৫৮১৩। আসিম ইবনে নযর তায়মী (রাহঃ) ......... আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে ইসলাম গ্রহণ করার পর কেউ কিছু চাইলে তিনি অবশ্যই তা দিয়ে দিতেন। আনাস (রাযিঃ) বলেন, এক ব্যক্তি নবী (ﷺ) এর কাছে এলো। তিনি তাকে এত বেশী ছাগল দিলেন যাতে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ হয়ে যাবে। তারপর সে ব্যক্তি তার সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে তাদের বললো, হে আমার জাতি ভাইয়েরা! তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। কেননা মুহাম্মাদ (ﷺ) (এত বেশী) দান করেন যে, তিনি ’ক্ষুধার্ত’ থাকার (অভাবগ্রস্ত হওয়ার) ভয় করেন না।


সহীহ মুসলিম হাদীস নং ২৩১২-১

হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/12862

এত বড় দানবীর ও দাতা হওয়ার পরেও আমাদের নবীর অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করুন!

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ 

« لم يأكل النبي - صلى الله عليه وسلم - على خوان حتى مات، وما أكل خبزًا مرققًا حتى مات».


নবী (ﷺ) আমৃত্যু টেবিলের উপর খাবার খাননি আর ওফাতের পূর্ব পর্যন্ত পাতলা রুটি খেতে পাননি।


সহীহ বুখারী হাদীস নং: ৬৪৫০

হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/6006



আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন: অনেক দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে এসে বলতেন:

«أعندك غداء»؟ فتقول: لا، فيقول: «إني صائم».

তোমার কাছে (সকালের) খাবার কিছু আছে কি? আমি বলতাম, না। তখন তিনি বলতেন, তাহলে আমি রোযা পালন করছি। আয়িশা (রাযিঃ) বলেন, এমনিভাবে তিনি একদিন এলেন। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের কাছে কিছু হাদিয়া এসেছে। তিনি বললেন, তা কি? আমি বললাম, হায়স (ঘি, পনির ও খেজুর মিশ্রিত এক প্রকার খাদ্য)। তিনি বললেন, সকাল থেকে তো রোযা পালন করছিলাম। আয়িশা (রাযিঃ) বলেন, এরপর তিনি তা আহার করলেন। 


জামে' তিরমিযী হাদীস নং৭৩৪

হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/30367



রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এমনও প্রমাণিত আছে যে,

 أنه كان يقيم الشهر والشهرين، لا يعيشه هو وآل بيته إلا الأسودان: التمر والماء. 

তিনি এক দুই মাস কাটিয়ে দিয়েছেন কিন্তু তাঁর ও পরিবারের জন্য দুই কাল বস্তু খেজুর ও পানি ব্যতীত জীবন ধারনের জন্য কিছুই জুটত না। (বুখারী,  হাদিস: ২৫৬৭; মুসলিম, হাদিস: ২৯৭২)


এত স্বল্প খাদ্য ও সাধারণ জীবনোপকরণের মাঝেও তাঁর চরিত্র ছিল অনন্য মহান এবং তাঁর প্রতিটি কর্ম ছিল ইসলামী আদর্শে ভাস্বর। তিনি সবসময় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। যিনি কষ্ট করে খাবার তৈরি করতেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ধন্যবাদ জানাতেন। খাবার তৈরিতে কোনো ভুলত্রুটি হলে তিনি কখনো প্রস্তুতকারকের প্রতি কঠোরতা দেখাতেন না। কারণ তিনি বিবেচনা করতেন যে, মানুষটি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে, হয়তো কোনো অনিবার্য কারণে খাবারটি মনের মতো হয়নি। [1, 2, 3, 4]

এজন্যই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো খাবারের কোনো খুঁত বা দোষ ধরতেন না এবং যিনি রান্না করেছেন (বাবুর্চী) তাকেও কখনো ভর্ৎসনা করতেন না। সামনে যা উপস্থিত থাকত, তিনি সানন্দে তাই গ্রহণ করতেন; কখনো ফিরিয়ে দিতেন না। আর যা ঘরে নেই, তা পাওয়ার জন্য কখনো আকাঙ্ক্ষাও করতেন না। ইনিই এই মুসলিম উম্মাহর মহান নবী, যাঁর জীবনের লক্ষ্য কখনোই ভূরিভোজন বা জাগতিক স্বাদ আস্বাদন ছিল না!



আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

«ما عاب رسول الله - صلى الله عليه وسلم - طعامًا قط، إن اشتهاه أكله، وإن كرهه تركه».

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোন খাদ্যের দোষ বর্ণনা করতেন না, ভাল লাগলে খেতেন আর না লাগলে খেতেন না। (বুখারী, হাদিস: ৩৫৩৬; মুসলিম, হাদিস: ২০৬৪)


যাঁদেরকে আজ পানাহারের ভোগ-বিলাসিতা ও অতিরিক্ত মোহ পেয়ে বসেছে, সেই প্রিয় দ্বীনি ভাইদের উদ্দেশ্যে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.)-এর একটি সংক্ষিপ্ত ও মূল্যবান বাণী তুলে ধরছি।

খাদ্য ও পোশাকের ব্যাপারে তিনি বলেন:

"পোশাক ও খাবারের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম আদর্শ হলো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ। আর খাবারের ব্যাপারে তাঁর নীতি ছিল—ভালো লাগলে তিনি পরিমিত পরিমাণে খেতেন; সামনে উপস্থিত কোনো খাবার কখনো ফিরিয়ে দিতেন না, আবার যা ঘরে নেই তা খোঁজাখুঁজিও করতেন না। সামনে মাংস ও রুটি এলে তিনি সেটাই খেতেন। কিংবা ফলমূল, মাংস ও রুটি হাজির হলে তা-ই খেতেন। আর যদি শুধু রুটি বা শুধু খেজুর পেতেন, তবে তা দিয়েই ক্ষুধা নিবারণ করতেন। তাঁর সামনে দুই পদের খাবার আনা হলে তিনি কখনো বলতেন না যে, 'আমি দুই পদের খাবার একসাথে খাব না।' আবার কোনো সুস্বাদু বা মিষ্টি খাবার সামনে এলে তিনি তা গ্রহণ করা থেকেও বিরত থাকতেন না।"

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই ভারসাম্যপূর্ণ আচরণের সমর্থনে হাদীসে এসেছে, তিনি বলেছেন:

 «لكني أصوم وأفطر، وأقوم وأنام، وأتزوج النساء وآكل اللحم فمن رغب عن سنتي فليس مني» 


কিন্তু আমি তো মাঝে মাঝে নফল রোযা রাখি, আবার মাঝে মাঝে রোযা ছেড়েও দেই। রাত্রে কিছু অংশ জেগে ইবাদাত করি ও কিছু অংশে ঘুমাই, আমি তো বিবাহ করেছি এবং গোশও ভক্ষণ করে থাকি। ওহে আমার উম্মত! তোমরা জেনে রেখো! যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে অবজ্ঞা করে, সে আমার উম্মতভুক্ত নয়। (মুসলিম, হাদিস: ১৪০১; নাসায়ী, হাদিস: ৩২১৭)


আল্লাহ তাআলা মানুষকে উত্তম ও পবিত্র খাদ্যসমূহ খাওয়ার এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা বা শুকরিয়া জ্ঞাপন করার নির্দেশ দিয়েছেন। যে ব্যক্তি কোনো পবিত্র ও হালাল খাদ্যকে নিজের জন্য হারাম মনে করে, সে মূলত আল্লাহর দেওয়া সীমা লঙ্ঘনকারী। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত খেয়ে তাঁর শুকরিয়া আদায় করে না, সে আল্লাহর হক নষ্ট করল। [1, 2, 3]

বস্তুত, এই খাদ্য ও পানাহারের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শই হলো সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ। কিন্তু সাধারণত দুই শ্রেণীর মানুষ এই সুন্নাহ বা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে:

১. অপচয়কারী ও ভোগবিলাসী: যারা নিজেদের ইচ্ছা ও খেয়ালখুশিমতো খাবার অপচয় করে এবং দ্বীনের প্রতি তাদের অর্পিত দায়িত্বসমূহ পালন করা থেকে বিরত থাকে।

২. বৈরাগ্যবাদী: যারা আল্লাহর দেওয়া উত্তম ও পবিত্র বস্তুগুলোকে নিজেদের জন্য হারাম করে নেয় এবং এমন বৈরাগ্যবাদের চর্চা করে যা আল্লাহ তাআলা কখনোই বিধান হিসেবে দেননি। মনে রাখতে হবে, ইসলামে কোনো বৈরাগ্যবাদের স্থান নেই। [1, 2, 3]

শায়খুল ইসলাম (রহ.) আরও বলেন:

"হালাল বস্তু মাত্রই উত্তম ও পবিত্র, আর সব উত্তম ও পবিত্র বস্তুই হালাল। আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহকে হালাল করেছেন এবং ঘৃণিত ও অপবিত্র বস্তুগুলোকে হারাম করেছেন। এই খাদ্যগুলো পবিত্র হওয়ার মূল কারণ হলো—এগুলো যেমন মানুষের স্বাভাবিক রুচিসম্মত, তেমনি শরীরের জন্যও অত্যন্ত উপকারী। অন্যদিকে, যে বস্তুগুলো আমাদের জন্য ক্ষতিকর ও ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি করে, আল্লাহ তাআলা সেগুলোকে আমাদের জন্য হারাম করেছেন। আর যা মানবজাতির জন্য কল্যাণকর ও উপকারী, আল্লাহ তাআলা তাই আমাদের জন্য হালাল করেছেন।"

তিনি পরিশেষে বলেন:

"পানাহার, পোশাক, ক্ষুধা ও তৃপ্তির ক্ষেত্রে মানুষের অনেক ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা বা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এমনকি একজন নির্দিষ্ট মানুষের জীবনেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অবস্থা আসতে পারে। তবে মানুষের জন্য সর্বোত্তম ও আদর্শ পথ হলো সেটাই, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ও অনুসরণ নিশ্চিত হয় এবং যা গ্রহণকারীর জন্য ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ বয়ে আনে।" (মাজমুউল ফাতাওয়া, ২২/৩১০)




No comments

Powered by Blogger.