Header Ads

শিক্ষার ক্ষেত্রে কি সন্তান পিতামাতার আদেশ পালনে বাধ্য?

প্রশ্ন:

সন্তান হাফেজ। এখন কওমি মাদ্রাসায় পড়তে চাচ্ছে। বাবা তাকে আলিয়া/কলেযে পড়িয়ে ইউরোপে পাঠাতে চাচ্ছেন। এসব ক্ষেত্রে বাবার কথা কি সে মানতে বাধ্য? বাবার কথা কতোটুকু মানা উচিত, এবং সব ক্ষেত্রে মানা উচিত নয়, দালিলিক উত্তর প্রত্যাশি।


উত্তর:

সম্মানিত প্রশ্নকারী!

সন্তানের উচ্চশিক্ষা এবং ক্যারিয়ার নির্বাচনের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার আদেশের পরিধি এবং ইসলামের বিধান অনুযায়ী, উক্ত বিষয়ে সন্তান তার বাবার কথা মানতে হুবহু বাধ্য নয়, তবে তার সাথে কোনোভাবেই অসদাচরণ বা বেয়াদবি করা যাবে না। 

ইসলামী শরিয়তের ফিকহী মূলনীতি অনুযায়ী, জীবনযাত্রার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত—যেমন পড়াশোনার মাধ্যম (কওমি বনাম আলিয়া/কলেজ) বা ক্যারিয়ার ও বাসস্থান (ইউরোপ বা দেশ) নির্বাচন করার ক্ষেত্রে পিতা-মাতার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা সন্তানের জন্য আবশ্যক বা 'ওয়াজিব' নয়। সন্তান যদি নিজের দ্বীন রক্ষা এবং উচ্চশিক্ষার জন্য কওমি মাদ্রাসাকে উত্তম মনে করে, তবে সে তা বেছে নিতে পারে। 


নিচে দালিলিক বিবরণ ও ফিকহী সীমানা উল্লেখ করা হলো:

১. পিতা-মাতার আনুগত্যের সাধারণ বিধান ও এর সীমাবদ্ধতা

ইসলামে পিতা-মাতার সেবা ও বাধ্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু এই আনুগত্য নিঃশর্ত নয়। আল্লাহর অবাধ্যতা কিংবা সন্তানের স্পষ্ট ক্ষতি বা অন্যায়ের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার আনুগত্য করা যাবে না। 


  • সূরা লোকমানে আল্লাহ তাআলা বলেন,
    "যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরিক করার জন্য বাধ্য করে, যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না। তবে তাদের সঙ্গে এই দুনিয়ায় উপযুক্ত সদয় আচরণ করো।" (সূরা লোকমান, আয়াত: ১৫)


  • রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন,
    “সৃষ্টিকর্তার অবাধ্য হয়ে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১০৬৫)
     

২. পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারে পিতা-মাতার আদেশের আইনি মর্যাদা

ফুকাহায়ে কেরামের মতে, পড়াশোনার শাখা, ক্যারিয়ার বা বিবাহের মতো ব্যক্তিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিমান সন্তানের রয়েছে।


  • ফতোয়া আল-ফিহকিয়্যাহ আল-কুবরা (ইমাম ইবনে হাজার আল-হাইতামী):
    "বিবাহ, বাসস্থান, ক্যারিয়ার বা শিক্ষাজীবন নির্বাচনের মতো ব্যক্তিগত বিষয়ে পিতা-মাতার আদেশ অমান্য করা 'উকুউক' বা অবাধ্যতার পাপের অন্তর্ভুক্ত নয়।" 


  • সন্তান যদি মনে করে ইউরোপে গেলে বা জেনারেল লাইনে পড়লে তার ঈমান-আমল ধরে রাখা কঠিন হবে, তবে নিজের দ্বীন সুরক্ষার স্বার্থে সে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।


        ৩. পিতা-মাতার আদেশ কখন মানা ওয়াজিব এবং কখন নয়?

        ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, পিতা-মাতার আদেশ মানার জন্য ৩টি শর্ত রয়েছে: 

  1. বৈধতা: আদেশটি শরিয়তসম্মত হতে হবে (হারাম বা গুনাহের কাজ হওয়া যাবে না)।

  2. যৌক্তিক কারণ: আদেশের পেছনে পিতা-মাতার বাস্তব কোনো উপকার বা যৌক্তিক উদ্দেশ্য থাকতে হবে।

  3. সন্তানের ক্ষতি না হওয়া: আদেশটি পালন করতে গিয়ে সন্তানের দ্বীনি, দুনিয়াবি বা শারীরিক কোনো স্পষ্ট ক্ষতি হওয়া যাবে না। 

বাবার ইউরোপে পাঠানোর ইচ্ছা যদি কেবলই জাগতিক লোভ বা বিলাসিতার জন্য হয় এবং সেখানে সন্তানের দ্বীন ও নৈতিকতা নষ্ট হওয়ার স্পষ্ট ঝুঁকি থাকে, তবে বাবার এই ইচ্ছা পূরণ করা সন্তানের জন্য মোটেও জরুরি নয়।

৪. সন্তানের জন্য বর্তমান করণীয় (পরামর্শ)

পিতার আদেশ হুবহু না মানার অবকাশ থাকলেও, তার সাথে সম্পর্ক নষ্ট করা বা কঠোর ভাষায় কথা বলা সম্পূর্ণ হারাম। সন্তানের উচিত হবে:

বিনম্র আচরণ: বাবাকে অত্যন্ত নরম ভাষায় নিজের ইচ্ছার কথা জানানো এবং তার প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা বজায় রাখা। 

  • মধ্যস্থতা: পরিবারের কোনো মুরুব্বি, স্থানীয় আলেম বা এমন কোনো ব্যক্তির সাহায্য নেওয়া—যার কথা বাবা শোনেন এবং মূল্যায়ন করেন। তার মাধ্যমে বাবাকে বোঝানো যে, আলিয়া মাদ্রাসা বা কওমি মাদ্রাসা উভয় মাধ্যমেই উচ্চশিক্ষা ও সুন্দর ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব।


  • সমন্বয় (যদি সম্ভব হয়): কওমি মাদ্রাসায় পড়ার পাশাপাশি দূরশিক্ষণ (Distance Learning) বা উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে আলিয়া বা জেনারেলের ডিগ্রি গ্রহণ করা যায় কি না, তা ভেবে দেখা যেতে পারে। এতে বাবার ইচ্ছারও কিছুটা সম্মান রক্ষা হয় এবং নিজের লক্ষ্যও অর্জিত হয়।


تفسیر القرطبی:

"الرابعة- عقوق الوالدين: مخالفتهما في أغراضهما الجائزة لهما، كما أن برهما موافقتهما على أغراضهما."

(سورۃ الاسراء،ج10،ص238،ط؛دارالجتب المصریۃ)

التفسیر المظہری:

"(مسئلة) لا يجوز إطاعة الوالدين إذا أمرا بترك فريضة او إتيان مكروه تحريما لان ترك الامتثال لامر الله والامتثال لامر غيره اشراك معنى ولما روينا من قوله عليه السّلام لا طاعة للمخلوق في معصية الخالق- ويجب إطاعتهما إذا أمر بشيء مباح لا يمنعه العقل والشرع."

(سورۃ لقمان،ج7،ص 256،ط؛المکتبۃ الرشدیه)





No comments

Powered by Blogger.