সাংসারিক কাজকর্ম না জানার কারণে স্ত্রীকে নির্যাতন করা, অভিশাপ দেওয়া
প্রশ্ন:
স্ত্রী ঘরের কাজ ও রান্না না জানার কারণে স্বামী যদি তাকে সারাক্ষণ মানসিক কষ্ট দেয় এবং বলে 'তোমাকে কখনো ক্ষমা করব না', 'আল্লাহর কাছে তোমাকে জবাবদিহি করতে হবে' এতে কি স্ত্রী অপরাধী হবে?"
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
ইসলামী শরীয়তের বিধান, পারিবারিক নীতি ও নৈতিকতার আলোকে স্ত্রী ঘরের কাজ বা রান্না না
কেননা জুমহুর বা অধিকাংশ ফুকাহায়ে কেরামের (যেমন—ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.) মতে, স্ত্রীর ওপর ঘরের কাজ, রান্নাবান্না, কাপড় ধোয়া বা ঘর ঝাড়ু দেওয়া শরীয়তগতভাবে বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব) নয় বরং বৈবাহিক চুক্তির মাধ্যমে স্ত্রীর মূল দায়িত্ব হলো স্বামীর সাহচর্য দেওয়া এবং সন্তানের লালন-পালন ও হিফাজত করা।
তবে হানাফী মাযহাবসহ কিছু ফকীহ মনে করেন, নৈতিক ও সামাজিক প্রথার (উরফ) ভিত্তিতে স্ত্রী ঘরের সাধারণ কাজগুলো করবে, যা পারস্পরিক ভালোবাসার অংশ। তবে স্ত্রী যদি ঘরের কাজ না জানে বা অসুস্থতার কারণে করতে না পারে, তবে তার ওপর জোর জবরদস্তি করা বা একে বাধ্যতামূলক মনে করা শরীয়তসম্মত নয়। কাজ না জানার কারণে তার কোনো গোনাহ হবে না।
স্বামী যদি এই কারণে স্ত্রীকে প্রতিনিয়ত অপমান করে, তবে স্বামী নিজেই গুনাহগার হচ্ছে এবং আল্লাহর কাঠগড়ায় তাকেই জবাবদিহি করতে হবে।
সূরা আন-নিসা: ১৯ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
অর্থ: এবং তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন করো।"
ব্যাখ্যা: স্ত্রীর সাথে সদ্ভাবের পরিপন্থী যেকোনো আচরণ, যেমন—রান্না না জানার কারণে সারাক্ষণ মানসিক কষ্ট দেওয়া এই আয়াতের স্পষ্ট লঙ্ঘন।)
সূরা আল-বাকারাহ: ২৩৩ নং আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে,
لَا تُكَلَّفُ نَفْسٌ إِلَّا وُسْعَهَا
অর্থ:"কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কষ্টের মুখোমুখি করা হবে না।"
সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৩৫১৫
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا»
অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, "তোমরা নারীদের সাথে সর্বোত্তম আচরণের উপদেশ গ্রহণ করো।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৩৩৩১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ১৪৬৮)
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
"তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের কাছে সর্বোত্তম।" (সুনান তিরমিযী)।
তিনি (সা.) কখনো তাঁর স্ত্রীদের সাথে ঘরের কাজ বা রান্নাবান্না নিয়ে কোনো প্রকার কটূক্তি বা অপমান করেননি।
"তোমাকে কখনো ক্ষমা করব না" এবং "আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে"—স্বামীর এই কথার হুকুম কী?
স্বামীর এই দাবি ও হুমকি শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ভুল, অযৌক্তিক এবং ভিত্তিহীন।
ক্ষমা না করার অধিকার: মানুষ কেবল তখনই অন্যের ওপর ক্ষোভ রাখতে পারে বা ক্ষমা না করার কথা বলতে পারে, যখন তার কোনো "শরয়ী হক" বা অধিকার নষ্ট হয়। যেহেতু রান্নাবান্না জানা বা করা স্ত্রীর ওপর বাধ্যতামূলক কোনো দায়িত্ব নয়, তাই এটি না করার কারণে স্বামীর কোনো হক নষ্ট হয়নি।
ভুল ধারণা: স্বামী এখানে নিজের ক্ষোভ ও অহংকারের বশে আল্লাহর নাম ব্যবহার করছেন। যে বিষয়ে আল্লাহ স্ত্রীকে অপরাধী সাব্যস্ত করেননি, সে বিষয়ে স্বামীর "ক্ষমা করব না" বলা একটি অর্থহীন অহংকার মাত্র। বরং অন্যায়ভাবে স্ত্রীকে মানসিক কষ্ট দেওয়ার কারণে স্বামীকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
করণীয় ও সমাধানের উপায়
একটি সুন্দর বৈবাহিক জীবন বজায় রাখার জন্য উভয় পক্ষের কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত:
স্বামী হিসেবে
• স্ত্রীকে মানসিক নির্যাতন ও অপমান করা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
• ঘরের কাজ বা রান্নাবান্না শেখার জন্য স্ত্রীকে সময় ও সহযোগিতা দিতে হবে (রাসূলুল্লাহ সা. নিজে ঘরের কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করতেন)।
• সামর্থ্য থাকলে একজন কাজের লোক বা সহায়তাকারী নিযুক্ত করে দেওয়া স্বামীর দায়িত্ব।
স্ত্রী হিসেবে
• স্বামীর অবান্তর কথায় মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ধারণ করা।
• সংসার সুন্দরভাবে পরিচালনার স্বার্থে এবং পারস্পরিক মহব্বত বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আস্তে আস্তে রান্নাবান্না ও ঘরের কাজগুলো শিখে নেওয়ার চেষ্টা করা।
সারকথা: ঘরের কাজ না জানার কারণে স্ত্রী কোনো গোনাহগার হচ্ছে না। তবে এই তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে স্বামী যে প্রতিনিয়ত স্ত্রীকে মানসিক কষ্ট ও গালমন্দ করছে, এর জন্য স্বামী নিজেই আল্লাহর কাছে দায়ী থাকবে।
স্বামীর জন্য নসিহা:
মহানবী (সা.) কখনো তাঁর স্ত্রীদের সাথে খারাপ আচরণ বা খিটমিটে মেজাজ দেখাতেন না। তিনি বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম।" (তিরমিজি)।
অপমান ও অভিশাপ দেওয়া বন্ধ করুন: কোনো মুসলিমকে অপমান করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা বা "কখনো ক্ষমা করব না" বলে আল্লাহর দোহাই দিয়ে মানসিক কষ্ট দেওয়া গুনাহের কাজ। অন্যায়ভাবে রাগ করা এবং অভিশাপ দেওয়া মুমিনের গুণ নয়।
সহযোগিতার হাত বাড়ান: রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘরে নিজের কাজ নিজে করতেন এবং স্ত্রীদের ঘরের কাজে সাহায্য করতেন। স্ত্রী যদি রান্না না-ই পারেন, তবে তাকে ভালোবাসার সাথে শেখানো বা সাহায্য করা স্বামীর দায়িত্ব, রাগারাগি করা নয়।
ভরণপোষণের সঠিক অর্থ বুঝুন: ইসলাম অনুযায়ী স্ত্রীকে খাবার, পোশাক ও বাসস্থান দেওয়া স্বামীর দায়িত্ব। রান্না করা খাবার নিশ্চিত করাও স্বামীর দায়িত্বের অংশ। স্ত্রী তা ভালোবেসে করে দেন। তাই এটি নিয়ে জোরজুলুম করা যাবে না।
স্ত্রীর জন্য নসিহা
(ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তা) ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা:
স্বামীর অন্যায় আচরণের মুখে ধৈর্য ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন, তবে আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন। আপনি মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য ও হিদায়াতের দোয়া করুন।
শেখার চেষ্টা ও সদিচ্ছা: যদিও রান্না করা আপনার ওপর ফরজ নয়, তবুও সংসারে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য এবং স্বামীকে খুশি করার নিয়তে আস্তে আস্তে রান্না শেখার চেষ্টা করতে পারেন। এটি আপনার সংসারে "সদকা" বা উত্তম আচরণ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর জন্য আপনি আল্লাহর কাছে বিশাল সওয়াপাবেন।
শান্তভাবে কথা বলা:
স্বামী যখন শান্ত থাকবেন, তখন তাকে বুঝিয়ে বলুন যে তাঁর এই অপমানজনক কথাগুলো আপনাকে কতটা কষ্ট দেয়। তাকে মনে করিয়ে দিন যে ভালোবাসা দিয়ে অনেক সহজে কাজ আদায় করা যায়, রাগ দিয়ে নয়।
দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি:
দাম্পত্য জীবন কেবল অধিকারের হিসাব-নিকাশ নয়, এটি টিকে থাকে দয়া ও ভালোবাসার (মুয়াদ্দাহ ওয়া রাহমাহ) ওপর।
সামান্য রান্না নিয়ে প্রতিদিনের ঝগড়া একটি সুন্দর পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
সমাধানের পথ: যদি সম্ভব হয়, কিছুদিন কোনো আত্মীয় বা অন্য কোনো রাঁধুনি/গৃহিণীর সাহায্য নিয়ে রান্নাটা আয়ত্ত করার চেষ্টা করুন। আর স্বামীকেও উচিত তাঁর আচরণ শুধরে নেওয়া, কারণ আল্লাহর দরবারে একজন স্ত্রীর চোখের জলের হিসাব স্বামীকে দিতে হতে পারে।
উত্তর প্রদানে
সাইদুজ্জামান কাসেমী
উস্তাজুল ইফতা, ওয়াল হাদিস,
জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা

No comments