Header Ads

 


ভবিষ্যতে পৃথিবীতে মানুষের কী হবে—একজন মুসলিমের প্রস্তুতি কী হওয়া উচিত?

সম্মানিত প্রশ্নকারী,

বর্তমানে বিভিন্ন ভিডিওতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবট, মানুষের কর্মসংস্থান হারানো, প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, পরিবেশের বিপর্যয় এবং ভবিষ্যতে মানুষের জীবন কেমন হবে—এসব নিয়ে নানা আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে। এসব ভিডিও দেখে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে: ভবিষ্যতে যদি মানুষের জীবনযাত্রা আমূল বদলে যায়, তাহলে একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের এখন থেকেই কী করা উচিত?

আপনার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভবিষ্যৎ নিয়ে শুধু ভয় পাওয়া যথেষ্ট নয়; আবার ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তা নিশ্চিতভাবে জানার দাবিও করা যায় না। আমাদের প্রয়োজন হলো—কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলার বাস্তব প্রস্তুতি নেওয়া।

কুরআন-সুন্নাহ কি ভবিষ্যতের এসব বিষয় নিয়ে নীরব?

কুরআন ও সুন্নাহতে ভবিষ্যতের প্রতিটি প্রযুক্তি, আবিষ্কার কিংবা সামাজিক পরিবর্তনের বিস্তারিত বিবরণ নেই। তবে ভবিষ্যতের বিপদ, ফিতনা, অর্থনৈতিক সংকট, নৈতিক অবক্ষয় এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কীভাবে জীবন পরিচালনা করতে হবে, সে বিষয়ে মৌলিক নির্দেশনা রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ

অর্থ: “তাদের মোকাবিলার জন্য তোমরা যথাসাধ্য শক্তি প্রস্তুত রাখো।” —সুরা আল-আনফাল, ৮:৬০

এই আয়াতের সরাসরি প্রসঙ্গ হলো শত্রুর মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা-সামর্থ্য প্রস্তুত করা। তাই আয়াতটিকে সব ধরনের ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির সরাসরি নির্দেশ বলা ঠিক হবে না। তবে এর মধ্যে সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।

একইভাবে, আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ

অর্থ: “যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার পেছনে ছুটো না।” —সুরা আল-ইসরা, ১৭:৩৬

অর্থাৎ, ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ভিডিওতে ভয়াবহ দাবি করা হলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া যাবে না। তথ্য যাচাই করতে হবে, অনুমানকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী মনে করা যাবে না এবং অজানা বিষয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়া যাবে না।

ভবিষ্যতের জন্য মুসলিমদের করণীয়: পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি

ঈমান ও আমলের প্রস্তুতি

প্রযুক্তি যত উন্নত হোক, মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখা, ফরজ ইবাদত পালন করা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়া।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

بَادِرُوا بِالْأَعْمَالِ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ

অর্থ: “তোমরা এমন ফিতনা আসার আগে নেক আমল করতে দ্রুত এগিয়ে যাও, যা অন্ধকার রাতের টুকরোর মতো হবে।” —সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৮

আমাদের শিক্ষা: ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে—এই আশঙ্কায় আতঙ্কিত না হয়ে এখন থেকেই নামাজ, কুরআন, হালাল উপার্জন, তাওবা এবং নেক আমলে যত্নবান হতে হবে। ফিতনা থেকে বাঁচার প্রস্তুতি কেবল ভবিষ্যতের বিষয় নয়; এটি বর্তমানের দায়িত্বও।

জ্ঞান ও দক্ষতার প্রস্তুতি

যদি ভবিষ্যতে AI ও রোবটের কারণে বহু প্রচলিত পেশা পরিবর্তিত হয়, তাহলে কেবল একটি দক্ষতার ওপর নির্ভর করে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একজন মুসলিমের উচিত নিজের পেশাগত জ্ঞান বাড়ানো, প্রযুক্তি সম্পর্কে শেখা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে উপকারী কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করা।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ، وَلَا تَعْجَزْ

অর্থ: “যা তোমার উপকারে আসে, তার জন্য সচেষ্ট হও; আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না।” —সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪

এই হাদিসের আলোকে আমাদের করণীয় হতে পারে:

  • নিজের পেশার পাশাপাশি নতুন উপকারী দক্ষতা শেখা।

  • প্রযুক্তি ও AI-কে বুঝে বৈধ ও কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করা।

  • সন্তানদের শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য নয়, বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতায়ও পারদর্শী করে তোলা।

  • ধর্মীয় জ্ঞান ও নৈতিকতা বজায় রেখে পরিবর্তিত পরিস্থিতির উপযোগী শিক্ষা গ্রহণ করা।

তবে AI-ই যে সবার কর্মসংস্থান কেড়ে নেবে, কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মানুষের জীবন সম্পূর্ণ বদলে যাবে—এমন সিদ্ধান্ত প্রমাণ ছাড়া নেওয়া উচিত নয়।

আর্থিক ও পারিবারিক প্রস্তুতি

ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সংকট, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন কিংবা সরবরাহব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। এগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকি; নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। তাই আতঙ্কে অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে স্বাভাবিক ও বিচক্ষণ প্রস্তুতি নেওয়া ভালো।

  • সামর্থ্য অনুযায়ী জরুরি প্রয়োজনের জন্য কিছু সঞ্চয় রাখা।

  • অপ্রয়োজনীয় ঋণ ও অপচয় কমানো।

  • একটিমাত্র আয়ের উৎসের ওপর নির্ভরতা কমানোর বৈধ উপায় খোঁজা।

  • পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় জীবনদক্ষতা শেখানো।

  • প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও সমাজের মানুষের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় রাখা।

এসব প্রস্তুতির উদ্দেশ্য দুনিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়া নয়; বরং দায়িত্বশীলভাবে জীবন পরিচালনা করা, যাতে সংকটে নিজের পরিবার এবং অন্যদেরও সাহায্য করা যায়।

ফিতনা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে বাঁচার প্রস্তুতি

বর্তমানে ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি ভিডিওগুলোর মধ্যে কিছু তথ্যনির্ভর, কিছু অনুমাননির্ভর, আবার কিছু মানুষের ভয় ও কৌতূহলকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয়। তাই প্রতিটি ভিডিওকে সমান গুরুত্ব দেওয়া যাবে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا

অর্থ: “হে মুমিনগণ! কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে নাও।” —সুরা আল-হুজুরাত, ৪৯:৬

যদিও আয়াতটির সরাসরি প্রসঙ্গ সংবাদ যাচাই, এর শিক্ষা আমাদের অনলাইন তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক।

কোনো ভিডিওতে যদি বলা হয়, “অমুক সালে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ বেকার হয়ে যাবে”, “মানুষ আর স্বাধীন থাকবে না” অথবা “অমুক প্রযুক্তির কারণে কিয়ামত আসন্ন”—তাহলে তার উৎস, প্রমাণ ও দাবির সীমা যাচাই করুন। কিয়ামতের সময় নির্ধারণ কিংবা অদৃশ্য ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত দাবি করার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকুন।

প্রযুক্তির ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে সচেতনতা

প্রযুক্তি নিজে সব সময় কল্যাণকর বা ক্ষতিকর নয়; এর ব্যবহার, উদ্দেশ্য ও পরিণাম বিবেচনা করতে হয়। AI ব্যবহার করে শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা ও জনকল্যাণে উপকার পাওয়া যেতে পারে। আবার নজরদারি, প্রতারণা, মিথ্যা প্রচার, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং মানুষের ওপর অন্যায় নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকিও থাকতে পারে।

তাই একজন মুসলিমের উচিত প্রযুক্তি সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাওয়া নয়, আবার প্রযুক্তিকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করাও নয়। বরং এর উপকার গ্রহণ, ক্ষতি প্রতিরোধ এবং নৈতিক ও শরয়ি সীমা মেনে চলা।

বড় বড় আলেমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত সমাধান দেন না কেন?

এখানে একটি বিষয় বোঝা জরুরি। ভবিষ্যতের প্রতিটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নিয়ে আলেমদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী আশা করা ঠিক নয়। কারণ, কোনো প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তার বাস্তব প্রভাব কী হবে এবং মানুষের জীবন কতটা বদলাবে—এসব নির্ধারণে প্রযুক্তিবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞের গবেষণাও প্রয়োজন।

আলেমদের দায়িত্ব হলো কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শরয়ি নির্দেশনা দেওয়া। যেমন—AI দিয়ে প্রতারণা করা, মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করা, বৈধ উপার্জনের বিকল্প তৈরি করা, প্রযুক্তির কারণে কর্মক্ষেত্রে অন্যায় করা কিংবা নতুন কোনো প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করার বিধান কী হবে।

অন্যদিকে, কোনো প্রযুক্তি দশ বছর পর পৃথিবীকে কী অবস্থায় নিয়ে যাবে, সেটি মূলত গবেষণা ও সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণের বিষয়; শরিয়তের দলিল দিয়ে এমন প্রতিটি ঘটনা নিশ্চিতভাবে বলে দেওয়া সম্ভব নয়।

তাই প্রয়োজন হলো আলেম ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের পারস্পরিক সহযোগিতা, যাতে প্রযুক্তির বাস্তবতা বোঝার পাশাপাশি তার শরয়ি বিধানও নির্ধারণ করা যায়।

তাহলে এখন থেকেই কীভাবে প্রস্তুতি নেব?

একজন মুসলিমের জন্য নিচের দৈনন্দিন প্রস্তুতিগুলো বাস্তবসম্মত হতে পারে:

প্রস্তুতির তালিকা

0/6 সম্পন্ন

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও নিয়মিত নেক আমলের প্রতি যত্নবান হওয়া।

প্রতিদিন কিছু সময় নতুন জ্ঞান ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা শেখা।

আয়ের সামর্থ্য অনুযায়ী সঞ্চয় করা, অপচয় কমানো এবং হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা।

পরিবারকে ডিজিটাল নিরাপত্তা, তথ্য যাচাই ও বাস্তব জীবনদক্ষতা শেখানো।

ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় ছড়ানো ভিডিওর বদলে নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও দায়িত্বশীল আলেমদের আলোচনা অনুসরণ করা।

নিজের পরিবার, প্রতিবেশী ও অসহায় মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর অভ্যাস গড়ে তোলা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

রাসুলুল্লাহ ﷺ এমন একটি শিক্ষা দিয়েছেন, যা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেয়।

إِنْ قَامَتِ السَّاعَةُ وَبِيَدِ أَحَدِكُمْ فَسِيلَةٌ، فَإِنِ اسْتَطَاعَ أَنْ لَا تَقُومَ حَتَّى يَغْرِسَهَا فَلْيَغْرِسْهَا

অর্থ: “কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও যদি তোমাদের কারও হাতে একটি চারাগাছ থাকে এবং সে তা রোপণ করতে সক্ষম হয়, তাহলে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আগে সে যেন তা রোপণ করে।” —মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ১২৯০২ (প্রচলিত নম্বরায়ন; সংস্করণভেদে নম্বর ভিন্ন হতে পারে)

এই হাদিসের শিক্ষা হলো, চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেও কল্যাণকর কাজ ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সবকিছু জানা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়; কিন্তু বর্তমানের দায়িত্ব পালন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব।

সুতরাং, ভবিষ্যতে পৃথিবী বদলে গেলেও একজন মুসলিমের প্রস্তুতি হবে দ্বিমুখী: একদিকে ঈমান, ইবাদত, আখিরাত ও নৈতিকতার প্রস্তুতি; অন্যদিকে জ্ঞান, দক্ষতা, আর্থিক স্থিতিশীলতা, প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা এবং মানুষের উপকার করার সক্ষমতা বৃদ্ধি।

আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারি। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করার অর্থ হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়; বরং যথাসাধ্য সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।



উত্তর প্রদানে

সাইদুজ্জামান কাসেমী 

উস্তাজুল  ইফতা, ওয়াল হাদিস,

জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা


No comments

Powered by Blogger.