বিজ্ঞান কি জীবনের নিয়ন্ত্রক?
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বাক্যটি আক্ষরিকভাবে বিশ্বাস করা বা মেনে নেওয়া যাবে না। তবে রূপক বা বাহ্যিক উপায়-উপকরণের (সবব) অর্থে এটি বিবেচনা করলে তা ঈমানের পরিপন্থী হবে না।
ইসলামের মূল আকীদা ও কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বিষয়টি নিচে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হলো:
১. আকীদার দৃষ্টিকোণ থেকে আক্ষরিক অর্থে এটি মানা যাবে না কেন?
ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস অনুযায়ী মানুষের জীবন, মৃত্যু, রিযিক এবং প্রাত্যহিক জীবনের সমস্ত বিষয়ের একমাত্র ও প্রকৃত নিয়ন্ত্রক হলেন আল্লাহ তাআলা। বিজ্ঞান কোনো স্বাধীন সত্তা নয়, বরং বিজ্ঞান হলো আল্লাহর সৃষ্টি করা প্রকৃতির নিয়মাবলিকে (খোদায়ী নিযাম) মানুষের আবিষ্কার করার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। কাজেই বিজ্ঞান প্রকৃত নিয়ন্ত্রক নয়; বরং বিজ্ঞান মানুষ দ্বারা আবিষ্কৃত ও নিয়ন্ত্রিত, আর মানুষ আল্লাহ তাআলা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ ۗ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
জেনে রেখো, সৃষ্টিও তাঁর এবং নিয়ন্ত্রণ ও আদেশও তাঁর। বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ বরকতময়।” (সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪)
অতএব, কেউ যদি আক্ষরিকভাবে মনে করে যে বিজ্ঞান নিজে থেকেই (আল্লাহর ক্ষমতা ছাড়া) মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে বা বিজ্ঞানই মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করছে, তবে তা শরিয়তের পরিভাষায় শিরক এবং কুফরির শামিল হবে।
২. রূপক বা বাহ্যিক অর্থে যেভাবে কথাটি বিবেচনা করা যায়
রচনায় বা সাধারণ কথাবার্তায় যদি বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রভাব ও আমাদের প্রাত্যহিক নির্ভরশীলতা বোঝানোর উদ্দেশ্যে বলা হয় "বিজ্ঞানই মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নিয়ন্ত্রক", এবং এর দ্বারা মানুষের আকীদা বা বিশ্বাস পরিবর্তন করা উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে রূপক অর্থে তা বলা শিরক হবে না।
যেমন—ঘুম থেকে ওঠা (অ্যালার্ম), যাতায়াত (যানবাহন), যোগাযোগ (মোবাইল ফোন), রান্না (গ্যাস/ওভেন) থেকে শুরু করে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি কাজ বিজ্ঞানের তৈরি প্রযুক্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত। এই বাহ্যিক প্রভাবের কারণে যদি কেউ রূপক অর্থে শব্দটিকে ব্যবহার করে থাকেন, তবে তা ঈমান বিধ্বংসী হবে না। কারণ, ইসলামে বাহ্যিক উপায়-উপকরণ (সবব) ব্যবহার করা জায়েজ। যেমন: কেউ অসুস্থ হলে ওষুধ খায়। বাহ্যিকভাবে ওষুধ রোগ নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় করে বলে মনে হলেও, মনে এই বিশ্বাস রাখতে হয় যে—নিরাময়কারী একমাত্র আল্লাহ।
৩. ভাষা চয়ন ও শ্রোতার বোধশক্তি বিবেচনা করার গুরুত্ব
ইসলামী শরিয়তে মানুষের আকল বা বোধশক্তি এবং জ্ঞানের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী বক্তব্য প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমন কোনো অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয় যা মানুষকে ফিতনা বা বিভ্রান্তিতে ফেলে। সহীহ মুসলিমের মুকাদ্দিমায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
مَا أَنْتَ بِمُحَدِّثٍ قَوْمًا حَدِيثًا لَا تَبْلُغُهُ عُقُولُهُمْ ۚ إِلَّا كَانَ لِبَعْضِهِمْ فِتْنَةً
“যখন তুমি কোনো সম্প্রদায়ের কাছে এমন কোনো কথা বা হাদীস বর্ণনা করবে যা তাদের জ্ঞানের অবোধগম্য, তখন তা তাদের কারো কারো জন্য ফিতনা (বিভ্রান্তি) হয়ে দাঁড়াবে।” (মুকাদ্দিমায়ে সহীহ মুসলিম, অনুচ্ছেদ-৩)
ভাষার এই সতর্কতা ও উত্তম বাচনভঙ্গির চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যায় আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সিরাতের মধ্যে। সহীহ বুখারীর (৬২০৩ নং) হাদীসে হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحْسَنَ النَّاسِ خُلُقًا، وَكَانَ لِي أَخٌ يُقَالُ لَهُ أَبُو عُمَيْرٍ — قَالَ: أَحْسِبُهُ — فَطِيمًا، وَكَانَ إِذَا جَاءَ قَالَ: «يَا أَبَا عُمَيْرٍ، مَا فَعَلَ النُّغَيْرُ» نُغَرٌ كَانَ يَلْعَبُ بِهِ...
“নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সবার চেয়ে বেশি সদাচারী ছিলেন। আমার একজন ভাই ছিল; তাকে ‘আবু উমায়র’ বলে ডাকা হতো। আমার অনুমান যে, সে তখন মায়ের দুধ ছেড়েছিল (ছোট শিশু)। যখনই তিনি আমাদের এখানে আসতেন, বলতেন: হে আবু উমায়র! তোমার নুগায়র (ছোট পাখি) কী করছে? সে একটি নুগায়র পাখি নিয়ে খেলত...” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৫৭৭০)
এই হাদীস ও ফিকহী নীতিমালা থেকে ইসলামের সুন্দর ও মার্জিত বাচনভঙ্গির কয়েকটি বড় দিক ফুটে ওঠে:
- উত্তম, সুন্দর ও মার্জিত উপায়ে কথা বলা।
- শ্রোতা বা যার সাথে কথা বলা হচ্ছে, তার সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক স্তর বিবেচনা করা।
- শ্রোতাকে তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ও পছন্দনীয় নামে সম্বোধন করা এবং মন্দ বা ফিতনা সৃষ্টিকারী শব্দ বর্জন করা।
মুমিনের জন্য চূড়ান্ত করণীয়
একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের বিশ্বাস ও ভাষার ব্যবহারে সতর্ক হওয়া আবশ্যিক। বিজ্ঞান কেবল একটি মাধ্যম বা উসিলা, আমাদের জীবনের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক একমাত্র আল্লাহ। রচনায় কিংবা বক্তব্যে অসাবধানতাবশত এমন কোনো শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা উচিত নয়, যা মানুষের ঈমান-আকীদায় সংশয় সৃষ্টি করে কিংবা ভুল বার্তা প্রদান করে।
তাই এই ধরনের প্রবন্ধ বা রচনায় বাক্যটিকে পরিমার্জন করে এভাবে লেখা উত্তম—"বর্তমান যুগে বিজ্ঞান মানুষের প্রাত্যহিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে" বা "বিজ্ঞান মানুষের জীবনের অন্যতম প্রধান সহায়ক।" এর ফলে কুরআন-সুন্নাহর আকীদার সাথেও কোনো সাংঘর্ষিকতা তৈরি হয় না এবং বিজ্ঞানের বাস্তব গুরুত্বও যথাযথভাবে প্রকাশ পায়। অর্থাৎ, যে বিষয়ের অবস্থান যেখানে, সেটাকে সেখানে রেখেই উপস্থাপন করা উচিত; তবেই তার সঠিক মূল্যায়ন হবে।

No comments