পরিবারকে গীবত থেকে বাঁচানোর উপায়
পরিবার মানুষের শান্তির নীড়। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের অজান্তেই এই শান্তির নীড়ে একটি মারাত্মক সামাজিক ও মানসিক ব্যাধি ঢুকে পড়েছে, তা হলো গীবত বা পরনিন্দা। অবসরে কিংবা পারিবারিক আড্ডায় খুব সাধারণ বিষয় হিসেবে অন্য মানুষের অনুপস্থিতিতে তাদের দোষত্রুটি নিয়ে আলোচনা করা এখন অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ ইসলামে এটিকে অন্যতম কবিরা গুনাহ বা বড় পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
নিজে গীবত থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি নিজের পরিবারকে এই পাপের হাত থেকে রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। নিচে কুরআন, সুন্নাহ এবং মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের আলোকে পরিবারকে গীবত থেকে বাঁচানোর কিছু কার্যকরী উপায় আলোচনা করা হলো:
১. গীবতের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি
পরিবারকে গীবত থেকে ফেরানোর প্রথম ধাপ হলো এর ভয়াবহ শাস্তি ও অপকারিতা সম্পর্কে তাদেরকে জানানো। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে গীবতকে কতটা ঘৃণ্য কাজ হিসেবে দেখিয়েছেন, তা তাদের মনে করিয়ে দেওয়া উচিত। আল্লাহ বলেন:
وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ
অর্থ: "এবং তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই কর।" (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১২)
এছাড়াও মিরাজের রাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) গীবতকারীদের যে ভয়াবহ শাস্তি নিজ চোখে দেখেছেন, সেই হাদিসটি পরিবারের সাথে শেয়ার করা যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"যখন আমাকে মিরাজে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন আমি এমন কিছু লোকের পাশ দিয়ে গেলাম যাদের নখগুলো ছিল তামার। তারা তা দিয়ে নিজেদের মুখমণ্ডল ও বুক আঁচড়াচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাঈল! এরা কারা? তিনি বললেন, এরা তারাই যারা মানুষের মাংস খেত (গীবত করত) এবং তাদের মান-সম্মানহানি করত।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৭৮)
২. আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া
পারিবারিক আড্ডায় যখনই কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষ চর্চা শুরু হবে, তখন সরাসরি ঝগড়া বা রাগারাগি না করে কৌশলে আলোচনার বিষয়বস্তু বদলে ফেলুন। কোনো শিক্ষণীয় পারিবারিক স্মৃতি, দেশের পরিস্থিতি, রান্নাবান্না, নতুন কোনো কাজের পরিকল্পনা অথবা কোনো ধাঁধা বা কুইজের আয়োজন করে সবার মন অন্যদিকে সরিয়ে নিন।
৩. অনুপস্থিত ব্যক্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়া ও প্রশংসা করা
যে মানুষটির গীবত করা হচ্ছে, তার কোনো একটি ভালো গুণের কথা সবার সামনে তুলে ধরুন। যেমন বলতে পারেন, "উনার এই অভ্যাসটা হয়তো একটু খারাপ, কিন্তু উনি বিপদের সময় আমাদের অনেক সাহায্য করেছিলেন।" অন্যের ভালো দিকগুলো আলোচনা করলে গীবত করার আগ্রহ এমনিতেই কমে যায়। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
مَنْ رَدَّ عَنْ عِرْضِ أَخِيهِ رَدَّ اللَّهُ عَنْ وَجْهِهِ النَّارَ يَوْمَ الْقِيَامَةِঅর্থ: "যে ব্যক্তি তার (অনুপস্থিত) ভাইয়ের সম্মানহানি রোধ করবে (অর্থাৎ গীবত করার সময় তার পক্ষে কথা বলবে), কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার মুখমণ্ডলকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন।" (সুনানে তিরমিযী, হাদিস: ১৯৩১)
৪. নিজের অবস্থান পরিষ্কার করা এবং মজলিস ত্যাগ করা
পরিবারের সদস্যদের নরম সুরে ও বিনয়ের সাথে বুঝিয়ে বলুন যে আপনি এই ধরণের আলোচনা পছন্দ করছেন না। যদি তারা আপনার অনুরোধের পরেও গীবত করা বন্ধ না করে, তবে সেখান থেকে সাময়িকভাবে উঠে অন্য ঘরে চলে যান। বারবার এমন করলে তারা বুঝতে পারবে যে আপনি এটি সমর্থন করছেন না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন:
وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّىٰ يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِঅর্থ: "আর যখন আপনি তাদেরকে দেখেন যারা আমার আয়াতসমূহের সমালোচনায় লিপ্ত হয়, তখন আপনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন (সেখান থেকে সরে যান), যতক্ষণ না তারা অন্য কথায় লিপ্ত হয়।" (সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৬৮)
৫. অলস সময়কে ভালো কাজে রূপান্তর করা
মানুষ সাধারণত তখনই গীবত করে যখন তারা অলস বসে থাকে। তাই পরিবারের সবাইকে সৃজনশীল বা ভালো কাজে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করুন। সবাই মিলে ইনডোর গেমস খেলা, কোনো ভালো ইসলামিক বই বা পত্রিকা পড়া, ঘরের টুকিটাকি কাজ বা বাগান করার মতো কাজে সবাইকে যুক্ত রাখলে গীবত করার সুযোগ কমে যাবে।
৬. নিজে আদর্শ বা উদাহরণ হওয়া
পরিবারকে বদলানোর আগে নিজেকে বদলাতে হবে। নিজে মুখের বা জিহ্বার সম্পূর্ণ হেফাজত করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِঅর্থ: "প্রকৃত মুসলমান সে, যার জিহ্বা এবং হাত থেকে অন্য মুসলমানরা নিরাপদ থাকে।" (সহীহ বুখারী, হাদিস: ১০)পরিবারের কেউ যখন দেখবে আপনি কখনোই কারো নামে মন্দ কথা বলেন না, তখন অবচেতনভাবেই আপনার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা বাড়বে এবং তারা আপনার সামনে গীবত করতে দ্বিধাবোধ করবে।
খুলাসা বক্তব্য:
একটি গীবতমুক্ত পরিবার গঠন করা রাতারাতি সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রচুর ধৈর্য, সঠিক কৌশল এবং নিয়মিত প্রচেষ্টা। রাগ বা উপদেশের সুরে কথা না বলে ভালোবাসার মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের বোঝাতে হবে। সর্বোপরি, তাদের মন মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য এবং হেদায়েতের জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দুআ করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এবং আমাদের পরিবারকে এই মারাত্মক গুনাহ থেকে রক্ষা করুন। আমীন।

No comments